প্রচ্ছদ অন্যান্য পৃষ্ঠা কারিগরির বেসিক ট্রেড নিয়ে দুই সংস্থার টানাটানি। সর্টকোর্স পরিচালকবৃন্দ যেতে চাননা এনএসডি’তে

কারিগরির বেসিক ট্রেড নিয়ে দুই সংস্থার টানাটানি। সর্টকোর্স পরিচালকবৃন্দ যেতে চাননা এনএসডি’তে

199
0

জিখবর ডেস্ক:
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বেসিক ট্রেড ৩৬০ ঘন্টা মেয়াদী কোর্স নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন (এনএসডি) কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেখানে যেতে চাননা বেসিক ট্রেড পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান প্রধানরা।

এ নিয়ে চলছে দুই সংস্থার লড়াই। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১২১টি ‘ট্রেড কোর্স’ চলমান। বোর্ডই সনদ দিচ্ছে। এখন এগুলিকে ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের’ (ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলাপমেন্ট বা এনএসডি) অধীনে নিতে চায় সরকারের একটি মহল। আগামী ১ জুলাই থেকে এসব কোর্স এনএসডির মাধ্যমে পরিচালনা হবে। তখন এনএসডি থেকেই প্রশিক্ষণের সনদ দেয়া হবে। কিন্তু ‘ট্রেড কোর্স’ পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি এনএসডির অধীনে যেতে নারাজ। এ নিয়ে বেসিক ট্রেড পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান প্রধান গণ বার বার সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রধান মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন এবং বিভিন্ন পত্র/পত্রিকায় সংবাদ প্রচারিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডও এই কর্তৃত্ব ছাড়তে আগ্রহী নয়।

সর্টকোর্স ট্রেড কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি সংগঠন রয়েছে সংগঠনের প্রধানরা বলেন, তারা জানতে পেয়েছেন-কারিগরি খাতে বিদেশ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি ডলারের একটি তহবিল আসছে। এই তহবিল নিয়ন্ত্রণের জন্যই ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে’ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ট্রেড কোর্সগুলি নিজেদের কব্জায় নিতে চায় সরকারের একটি বিশেষ মহল।

পরিষদের নেতাদের দাবি, বর্তমানে এনএসডির অধীনে মাত্র ৭/৮টি ট্রেড কোর্স পরিচালনা হচ্ছে। এর অধীনে আরো ১২১টি কোর্স গেলে নতুন করে এগুলি পরিচালনার জন্য নিবন্ধন, অনুমোদন বা অন্যান্য অনুমতি নিতে হবে। এতে বাড়তি খরচ গুণতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। নানা ঝামেলাও পোহাতে হবে। প্রশিক্ষণার্থীদের ওপর বাড়তি খরচের বোঝাও চাপবে। এসব কোর্স পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত সক্ষমতাও এনএসডির নেই বলে নেতাদের দাবি।

এছাড়া কারিগরির সনদের কোন মেয়াদ নেই। যে কোন সময় যে কোন প্রতিষ্ঠানে সনদটি ব্যবহার করা যাবে কিন্তু এনএসডির সনদের মেয়াদ আছে। মেয়াদ পার হয়ে যাওয়ার পর সেটি আর কোন প্রতিষ্ঠানে দেয়া যাবে না।

পরিচালকগণ আরো বলেন এনএসডি মূলত লেভেল-১, লেভেন-২ ইত্যাদি প্রশিক্ষণ দেয়।
পক্ষান্তরে কারিগরির বেসিক ট্রেড প্রতিষ্ঠানগুলো যে সকল ছাত্র/ছাত্রীরা কম্পিউটার জানেনা তাদের মাউস ও কী-বোর্ড ধরা শিক্ষা দেয়। একেবারেই বেসিক শিখায়। কম্পিউটার অফিস এ্যাপলিকেশন, ডাটাবেজ ইত্যাদি শেখায়। যারা কোনদিন কম্পিউটার ওপেন করেনি তাদেরকে কম্পিউটার শিক্ষা দিয়ে কাজে লাগায়। তাহলে যদি এসব প্রতিষ্ঠান এনএসডিতে যায় তাহলে এদের কাজ কি? কম্পিউটার না জানা ছাত্রগুলো কিভাবে লেভেল-১/২ শিখবে?

পরিচালগণ বলেন যদি তাদের এসব প্রতিষ্ঠান এনএসডিতে যায় তাহলে এ দেশের কম্পিউটার না জানা লক্ষ লক্ষ ছাত্র কম্পিউটার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে।

জানতে চাইলে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আলী আকবর খান বলেন, বোর্ড পরীক্ষা নিয়ে সনদ প্রদান করে। বর্তমানে তারা ৩৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের এই কার্যক্রম পরিচালনা করেন। কিন্তু এখন শর্ট কোর্সের সনদও দিতে চাইছে এনএসডি।

এতে আইনি জটিলতা হতে পারে বলে তিনি বলেন, একই বিষয়ে বোর্ডকে কর্তৃত্ব দেয়া আছে। এখন পৃথক আইনে এনএসডির অধীনেও তা করতে চাচ্ছে। এ কারণে আইনি জটিলতা দেখা দিয়েছে।

এনএসডির অধীনে শর্ট কোর্সের নিয়ন্ত্রণ গেলে এই কোর্সের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখিন হবে। এনএসডিতে যাওয়ার বা নিবন্ধন করার সক্ষমতাও তারা হারাবে। এতে করে ৩৭০০ প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষক/কর্মচারী কাজ হরিয়ে পথে বসবে।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে জানা গেছে, বর্তমানে সারাদেশে প্রায় তিন হাজার সাতশ’টি সরকারি, বেসরকারি ও একটি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ১২১টি কোর্স চলমান। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর প্রায় তিন থেকে চার লাখ তরুণ-তরুণীকে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন (প্রাথমিক স্তর) ‘দক্ষ মানব সম্পদ’ তৈরি করা হচ্ছে।

এসব কোর্স সম্পন্ন করে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উদ্যোক্তা হয়ে বেকার সমস্যা সমাধানে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে বলেও ট্রেড কোর্স পরিচালকরা জানিয়েছেন। এসব কোর্স সম্পন্ন করে অনেকে বিদেশে গিয়ে রেমিটেন্স পাঠিয়েও অবদান রাখছেন।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনএসডিএ ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠা হয়। দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলার নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংস্থাটি গড়ে তোলা হয়েছে। এই সংস্থার চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর গভর্নিং বডিতে আছেন মন্ত্রী, সচিবসহ মোট ২৯ জন। গত পাঁচ বছরে এনএসডিএ থেকে প্রায় ১১ হাজার প্রশিক্ষণার্থীকে সনদ দেয়া হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, কারিগরি বোর্ড এনটিভিকিউএফ লেভেল নিয়ে কাজ করছে। এসব কোর্স বিএনকিউএফ এর কোন কোর্স নয়। এ কোর্সটি শুধু প্রাথমিক স্তরে তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক ক্লাসের মাধ্যমে অদক্ষদের সহায়তা দানের একটি কোর্স।

অন্যদিকে এনএসডিএ এনটিভিকিউএফ লেভেল পরিচালনা করে থাকে, ফলে দুই কোর্সের মধ্যে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় নেই। বরং প্রাথমিক স্তরের সার্টিফিকেট কোর্স করার পর কোন প্রশিক্ষণার্থী উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে চাইলে এনএসডিএ এর অধীনে কোর্স করতে পারবে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।

এ পরিপ্রেক্ষিতে এনএসডিএ এপেক্স বডি হিসেবে কারিগরি বোর্ডকে তদারকি করতে পারে। দেশে বিভিন্ন সংস্থা, যেমন- যুব উন্নয়ন, প্রবাসীকল্যান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক, সমাজ সেবাসহ প্রায় ৪০/৫০টি প্রতিষ্ঠানে এসব কোর্স করছে, অথচ স্বীকৃত কারিগরি বোর্ড থেকে এ সব কোর্সগুলো বন্ধ করলে এনএসডিএ এর অধীনের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশিক্ষণার্থী স্বল্পতায় পড়বে এবং সেই সঙ্গে দেশের কারিগরি শিক্ষার হার মুখ থুবরে পড়বে বলে আশঙ্কা ‘শর্ট কোর্স পরিচালকদের’।

এ বিষয়ে ‘শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির’ (নায়েম) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক শেখ ইকরামুল কবির বলেন, ‘কারিগরির একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা বোর্ড থাকতে এর কার্যক্রম অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার অধীনে নেয়ার কোনো যুক্তি নেই। এতে শুধু টাকা-পয়সা ব্যয় হবে; দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হবে।’

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বিরুদ্ধে নানা রকম অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে মন্তব্য করে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব শেখ ইকরামুল কবির আরো বলেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ। বোর্ডের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেগুলি না করে এর কার্যক্রম অন্যত্র স্থানান্তর করলে কোনো লাভ হবে না।’

বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ১৯৯৫ সাল থেকে জাতীয় দক্ষতামান বেসিক (৩৬০ ঘণ্টা মেয়াদি) কোর্সসমূহ যথাযত অনুমোদন, যুগোপযোগী নীতিমালা, প্রবিধান ও পাঠ্যক্রম অনুসরণ এবং সুন্দরভাবে পরীক্ষাগ্রহণ ও সনদায়নের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম ‘সুনাম ও দক্ষতার’ সঙ্গে পরিচালিত হয়ে আসছে।

১ জুলাই থেকে এনএসডিতে কয়েকটি কোর্স চালু :
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সভাপতিত্বে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যনির্বাহী কমিটির ১৩তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। গত ১৮ মার্চ ওই সভার কার্যবিবরণী প্রকাশ হয়।

এতে বলা হয়, আগামী ১ জুলাই থেকে দক্ষতা সংক্রান্ত ৩৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণের কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড (সিএস), কোর্স অ্যাক্রিডিটেশন ডকুমেন্ট (সিএডি), কম্পিটেন্সি রেজড কারিকুলাম (সিবিসি) প্রণয়ন, অ্যাসেসমেন্ট পরিচালনা এবং সনদায়নসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এনএসডির মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

সর্টকোর্স পরিচালকদের সাফ কথা, তারা কোন অবস্থাতেই এনএসডিতে যেতে চায় না। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডেই থাকতে চায়। এ জন্য তারা প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন জানিয়েছেন।
এনএসডিতে যাওয়ার জন্য যদি জোর করা হয় তাহলে তারা বড় ধরনের আন্দোলন করার হুশিয়ারি দেন বলে জানা গেছে।

বেসিক ট্রেডগুলোকে যাতে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডেই রাখা হয় তার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন তিন হাজার সাতশত বেসিক ট্রেডের পরিচালকমন্ডলী।