এস.এম.সাইফুল ইসলাম কবির: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম ঘোষণা দিয়েছেন—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর খাল খনন কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় মোংলা ও রামপালের সব সরকারি খাল সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। আর কোনো সরকারি খাল ইজারা বা দখলে থাকবে না।
শনিবার দুপুরে মাদুরপাল্টা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশে মাটি কেটে খনন কাজের উদ্বোধন করেন প্রতিমন্ত্রী। এই উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সূচিত হলো উপকূলীয় জনপদ মোংলা-রামপালের কৃষকদের নতুন স্বপ্নযাত্রা—জলাবদ্ধতামুক্ত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষির পথে এক প্রত্যাবর্তন।
চার দশক পর প্রাণ ফিরে পাবে খাল উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ চার দশক পর খালগুলো পুনঃখননের ফলে এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসন হবে এবং কৃষকরা কৃষিকাজে সুবিধা পাবেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও পরিবেশ সুরক্ষায় এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “জনগণের রক্ত চুষে খাওয়ার দিন শেষ। মোংলা-রামপালের প্রতিটি সরকারি খাল এখন থেকে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।” যারা দীর্ঘদিন ধরে খাল দখল করে মাছ চাষ বা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার করেছেন, তাদের স্বেচ্ছায় দখল ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অন্যথায় কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারিও দেন।
৮.৫ কিলোমিটার জুড়ে বৃহৎ পুনঃখনন প্রকল্প প্রথম পর্যায়ে মোংলার চারটি গুরুত্বপূর্ণ খাল—মাদুরপাল্টা, ভোলা নদী, পালেরখন্ড ও বেনীরখন্ড—মোট সাড়ে ৮ কিলোমিটার অংশ পুনঃখনন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায়— প্রায় ২৬ লক্ষ ১৪ হাজার ৬৫৭ ঘনফুট মাটি অপসারণ করা হবে খালের উপরের প্রস্থ ২৫ ফুট নিচের প্রস্থ ৫ ফুট গভীরতা ৮ ফুট নিশ্চিত করা হবে এতে জোয়ার-ভাটার পানি অনায়াসে চলাচল করতে পারবে। প্রায় ৪৯ লাখ ৬৭ হাজার ৮৪৭ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্প আগামী ৩০ মার্চের মধ্যে শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রশাসনের জিরো টলারেন্স বার্তা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমীন আক্তার সুমী। তিনি জানান, খাল দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং খালের স্বাভাবিক প্রবাহ সচল রাখতে উপজেলা প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী পুলিশ সুপার রেফাতুল ইসলামসহ স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। বেসরকারি সংস্থা সিএনআরএস-এর ‘নবপল্লব’ প্রকল্পের অধীনে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সোহাগ এন্টারপ্রাইজের কারিগরি সহায়তায় খনন কাজ বাস্তবায়িত হবে।
আবেগে ভাসলেন কৃষকরা খনন কাজ শুরু হতেই স্থানীয় এক বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষক আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “৪০ বছর পর এই খালে আবার পানির কলকল শব্দ শুনব—ভাবতেই চোখে পানি চলে আসে।”
উপকূলীয় এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও লোনা পানির অভিশাপ থেকে মুক্তির আশায় বুক বেঁধেছেন স্থানীয়রা। খালগুলোর প্রাণ ফিরে পাওয়ায় কৃষিজীবী মানুষের মাঝে ফিরে এসেছে স্বস্তি ও আশাবাদ।
শুধু খনন নয়, এক পুনর্জাগরণের অঙ্গীকার বক্তারা বলেন, এটি শুধু মাটি কাটার কাজ নয়—এটি মোংলার কৃষি ও পরিবেশকে পুনর্জীবিত করার লড়াই। শহীদ জিয়ার খাল খনন বিপ্লবের চেতনায় শুরু হওয়া এই উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রীর কণ্ঠে ছিল দৃঢ় ঘোষণা— “কোনো ইজারা নয়, কোনো দখল নয়—প্রতিটি সরকারি খাল হবে জনগণের।”
হাজারো মানুষের করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। দীর্ঘ চার দশক পর অবরুদ্ধ খালগুলো মুক্ত হয়ে আবারও প্রবাহিত হবে—এই প্রত্যাশায় মোংলা-রামপালের আকাশে যেন বইছে নবজাগরণের হাওয়া।

















