এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে:

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণার কয়েক বছরের মধ্যেই আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে জলদস্যুদের অপহরণ বাণিজ্য। সর্বশেষ ঘটনায় মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত ১০ জেলের মধ্যে ছয়জন মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেও এখনো চার জেলের কোনো সন্ধান মেলেনি। ঘটনাটি সুন্দরবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও দস্যু দমনের বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

শনিবার ভোর রাতে আনারুল, ইমরান ও সুশান্ত এবং শুক্রবার সকালে সাদ্দাম, ইউনুস আলী ও সাইফুল ইসলাম জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। তবে তাদের মুক্তির পেছনে কাজ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়—বরং পরিবারের দেওয়া মুক্তিপণের টাকা। মুক্তিপণের অঙ্কেই নির্ধারিত জীবন-মৃত্যু

ফিরে আসা জেলে ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অপহৃতদের মুক্তি পেতে ধাপে ধাপে জলদস্যুদের কাছে টাকা পৌঁছে দিতে হয়েছে। সাদ্দামের জন্য ৪০ হাজার টাকা, আনারুল, সুশান্ত ও ইমরানের জন্য মাথাপিছু ৩৫ হাজার টাকা, ইউনুস আলী ও সাইফুল ইসলামের জন্য মাথাপিছু ২৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিতে হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, দর-কষাকষির মাধ্যমে মুক্তিপণের অঙ্ক নির্ধারণ করা হয় এবং মোবাইল নেটওয়ার্কবিহীন নদীপথে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে এনামুল ও হযরতসহ চার জেলের এখনো কোনো খোঁজ নেই। তাদের পরিবার প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে।

অপহরণ হলেও প্রশাসনের কাছে নেই তথ্য! সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অপহরণ ও মুক্তির পুরো প্রক্রিয়া প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক নথিতে নেই। সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন অফিসার মোঃ ফজলুল হক জানান, অপহরণ বা জেলেদের ফিরে আসা সম্পর্কে বনবিভাগকে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।

অন্যদিকে শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ খালেদুর রহমান বলেন,
“অপহৃতদের জীবনের ঝুঁকির কারণে অনেক সময় জেলেরা নিজেরাই বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করে। ফলে পুলিশ তথ্য পায় না। তবে ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, “তথ্য না দেওয়ার” পেছনে রয়েছে ভয়—দস্যুদের প্রতিশোধের আশঙ্কা।

দস্যুমুক্ত সুন্দরবন—ঘোষণা আর বাস্তবতার ফারাক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে জানান, গত ১ এপ্রিল বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে কঠোর নির্দেশনা দেন। এরপর র‌্যাব, কোস্টগার্ড, বিজিবি ও পুলিশের টহল বাড়ানো হলে জলদস্যুরা অপহৃতদের নিয়ে বনাঞ্চলের আরও গভীরে সরে যায়।

তাদের দাবি, দস্যুরা এখন আগের মতো প্রকাশ্যে নয়—ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নদীপথে অপহরণ চালাচ্ছে, যাতে বড় অভিযানে ধরা না পড়ে।

অপহরণের নেপথ্যে ‘ডন’ ও ‘আলিম’ বাহিনী গত ৩০ মার্চ সুন্দরবনের চুনকুড়ি, মালঞ্চ ও মামুন্দো নদী এলাকায় মাছ ধরার সময় ‘ডন’ ও ‘আলিফ ওরফে আলিম’ বাহিনীর পরিচয়ে অস্ত্রধারীরা ১০ জেলেকে অপহরণ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দ্রুতগতির ট্রলার ব্যবহার করে তারা অভিযান চালায়।

স্থানীয় বনজীবীদের অভিযোগ, এসব বাহিনী মৌসুমভিত্তিক সক্রিয় হয়—বিশেষ করে মাছ ধরা ও মধু আহরণ মৌসুমে। একই দিনে মৌয়াল আটক, নিরাপত্তা নিয়ে দ্বিমুখী প্রশ্ন এদিকে সুন্দরবনের নোটাবেঁকী টহল ফাঁড়ি সংলগ্ন অভয়ারণ্য এলাকায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করে মধু সংগ্রহের অভিযোগে সাত মৌয়ালকে আটক করেছে বন বিভাগের স্মার্ট টহল দল। তবে দুর্গম এলাকায় নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় আটক ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।  স্থানীয়দের প্রশ্ন—যেখানে মৌয়ালদের দ্রুত আটক করা সম্ভব, সেখানে জলদস্যুরা কীভাবে বারবার অপহরণ চালায়?  ভয়, নীরবতা ও অদৃশ্য অর্থনীতির জাল

সুন্দরবন ঘিরে তৈরি হয়েছে এক নীরব অর্থনীতি—যেখানে অপহরণ, মুক্তিপণ, মধ্যস্থতাকারী ও ভয়ের সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অধিকাংশ ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না, ফলে প্রকৃত চিত্র প্রশাসনিক পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত নদীপথ নজরদারি, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বনজীবীদের জন্য জরুরি সুরক্ষা প্রটোকল চালু না হলে সুন্দরবনে অপহরণ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।

নিখোঁজ চার জেলের অপেক্ষায় পরিবার এখন সুন্দরবনের নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোতে একই প্রশ্ন ঘুরছে—ফিরে আসা ছয়জনের মতো কি বাকি চারজনও ফিরে আসবে? নাকি সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে তাদের ভাগ্য অজানাই থেকে যাবে?

সুন্দরবনের জীবন-জীবিকা নির্ভর হাজারো জেলে ও মৌয়ালের কাছে তাই নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার নাম।