মোরেলগঞ্জে সাইক্লোন শেল্টার কাম বিদ্যালয়ে চরম শিক্ষাসংকট
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি:
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে একটি সাইক্লোন শেল্টার কাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একাধিক কক্ষ দখল করে টানা ১৬ বছর ধরে চলছে পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রম। ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে হচ্ছে নিচতলার গবাদি পশুর আশ্রয়স্থলকে অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে রূপান্তর করে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা।
ঘটনাটি উপজেলার জিউধরা ইউনিয়নের ১৩৪ নং লক্ষীখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রিক। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সাইক্লোন শেল্টারটির দ্বিতীয় তলার তিনটি কক্ষ ও ওয়াশরুম দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ ফাঁড়ির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে পুলিশ সদস্যদের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যালয়ের পাঠদান চলছে নিচতলার খোলা গবাদি পশুর আশ্রয়স্থানে টিনের বেড়া দিয়ে তৈরি তিনটি অস্থায়ী কক্ষে।
স্থানীয়রা জানান, এই কক্ষগুলোতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নেই। নেই বিদ্যুৎ সংযোগ কিংবা বৈদ্যুতিক ফ্যান। শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য আলাদা শৌচাগারও নেই। বর্ষা মৌসুমে কক্ষগুলো স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়ে এবং গরমের সময় অসহনীয় তাপদাহে শিশুদের ক্লাস করতে হয়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, এমন অনুপযোগী পরিবেশে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিশুদের মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে, উপস্থিতির হারও কমে যাচ্ছে। একই ভবনে পুলিশি কার্যক্রম চলার কারণে বিদ্যালয়জুড়ে এক ধরনের ভীতিকর ও আনুষ্ঠানিক পরিবেশ বিরাজ করছে, যা শিশু শিক্ষার জন্য মোটেও সহায়ক নয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নীরা রানী তাফালী বলেন,
“বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১২৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে তিনটি শ্রেণিকক্ষ পুলিশ ফাঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে নিচতলার গবাদি পশুর আশ্রয়স্থানে টিনের বেড়া দিয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক বলেন,
“একদিকে শিশুদের ক্লাস, অন্যদিকে পুলিশি কার্যক্রম, সালিশ-বিচার, সাধারণ মানুষের যাতায়াত—সব মিলিয়ে বিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। ছোট ছোট বাচ্চারা এতে আতঙ্কিত থাকে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ২০০১ সালে জিউধরা ইউনিয়নে একটি অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফাঁড়ির জন্য জমি অধিগ্রহণও করা হয়। তবে দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো নিজস্ব ভবন নির্মাণ হয়নি। ফলে বাধ্যতামূলকভাবে বিদ্যালয় ভবনেই চলছে ফাঁড়ির কার্যক্রম।
এ বিষয়ে মোরেলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুর রহমান বলেন,
“লক্ষীখালী অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ির জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ভবন নির্মাণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হলে বিদ্যালয় ভবন থেকে পুলিশ সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হবে।”
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার মো. শেফাইনূর আরেফিন বলেন,
“একই ভবনে শিশুদের পাঠদান ও পুলিশি কার্যক্রম চলতে পারে না। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শিক্ষাবিদদের মতে, বিদ্যালয় হচ্ছে শিশুদের নিরাপদ, আনন্দময় ও সৃজনশীল বিকাশের স্থান। সেখানে পুলিশি পরিবেশ বা প্রশাসনিক কার্যক্রম শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
একটি সাইক্লোন শেল্টার, যা দুর্যোগকালে মানুষের জীবন বাঁচানোর আশ্রয়কেন্দ্র হওয়ার কথা, সেটিই আজ শিশু শিক্ষার করুণ বাস্তবতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ ছাড়া এ সংকট নিরসনের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে করছেন এলাকাবাসী।






















