এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি:

বাংলা নববর্ষ মানেই নতুন আশার আলো, প্রাণের উচ্ছ্বাস আর বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ। সেই আবহেই বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখ। দিনব্যাপী নানা আয়োজনে প্রাণ ফিরে পায় জনপদটি—গ্রাম থেকে শহর, সবখানেই ছিল আনন্দের ঢেউ।

উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বর্ষবরণ উৎসব পরিণত হয় এক মিলনমেলায়, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে অংশ নেন। সকাল থেকেই উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানুষের ঢল নামে। বর্ণিল পোশাকে সজ্জিত শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ—সবাই যেন নতুন বছরের আগমনী বার্তাকে বরণ করে নিতে ব্যস্ত।

১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে বের হয় এক বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রায় ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা প্রতীক—মাটির তৈরি মুখোশ, লোকজ মোটিফ, পাখি-প্রাণীর প্রতিকৃতি এবং বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী রঙের ছোঁয়া। শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় উপজেলা চত্বরে এসে শেষ হয়। পুরো আয়োজন জুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ ও জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

বৈশাখী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আব্দুল আলীম। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হাবিবুল্লাহ, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) প্রতিনিধি, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা।

শোভাযাত্রা শেষে স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এ আয়োজনে পরিবেশিত হয় বর্ষবরণের গান, লোকসংগীত, কবিতা আবৃত্তি এবং নৃত্য পরিবেশনা। প্রতিটি পরিবেশনাই দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং নতুন বছরের আনন্দকে আরও গভীর করে তোলে।

এদিকে, গ্রামীণ ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে উপজেলা পরিষদ চত্বরে বসে বৈশাখী মেলা। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের আয়োজনে মেলায় সাজানো হয় পিঠা-পুলি, ঐতিহ্যবাহী খাবার, নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প, খেলনা ও হস্তশিল্পের নানান স্টল। মেলায় আগত দর্শনার্থীরা এসব পণ্য ঘুরে ঘুরে দেখেন ও ক্রয় করেন, যা স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও তৈরি করে নতুন সম্ভাবনা।

পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। হাসি-আনন্দ, গান আর মিলনমেলার মধ্য দিয়ে মোরেলগঞ্জবাসী বরণ করে নেয় নতুন বছরকে।

অনুষ্ঠানের পরিশেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অংশগ্রহণকারীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ আরিফুল ইসলাম।

উৎসবের এই রঙিন আয়োজন যেন নতুন বছরের প্রতিটি দিনকে করে তুলুক আনন্দময়—এই প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেন অংশগ্রহণকারীরা।