কুরবানীর সংজ্ঞাঃ
আরবী (قربان) শব্দটি ফারসী বা ঊর্দূতে ‘কুরবানী’ রূপে পরিচিত হয়েছে, যার অর্থ ‘নৈকট্য’। পারিভাষিক অর্থে القُرْبَانُ مَا يُتَقَرَّبُ بِهِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى ‘কুরবানী’ ঐ মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাছিল হয়’। সূর্য উপরে ওঠার সময়ে ‘কুরবানী’ করা হয় বলে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল আযহা’ বলা হয়ে থাকে।
উদ্যেশ্যঃ
(ক) আল্লাহ বলেন,وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُم مِّن شَعَائِرِ اللَّهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ ‘আর কুরবানীর পশু সমূহকে তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে’ (হজ্জ ২২/৩৬)।
فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَىٰ فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَىٰ ۚ قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۖ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ
অর্থ: “অতঃপর সে যখন পিতার সাথে কাজকর্ম করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইব্রাহিম বলল, ‘হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি। এখন বলো, তোমার অভিমত কী?’ সে বলল, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।'” (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০২)
পিতা ছুরি চালালেন, আর পুত্র আল্লাহর হুকুমে গর্দান পেতে দিলেন। আল্লাহ তাআলা পিতা-পুত্রের এই চরম আনুগত্য ও তাকওয়া কবুল করলেন এবং ইস্মাঈলের পরিবর্তে জান্নাত থেকে একটি দুম্বা পাঠিয়ে তা জবেহ করার ব্যবস্থা করলেন। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ * وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ *
‘আল্লাহ তায়ালা (ইসমাঈলের) পরিবর্তে যবেহ করার জন্য একটি মহান কুরবানী দান করেছেন’। ‘এবং এই কুরবানীকে পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করেছেন’ (ছাফফাত ৩৭/১০৭-১০৮)।
আল্লাহ বলেন, فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ (الكوثر ২)- ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর’ (সূরা কাওছার ১০৮/২)। কাফির-মুশরিকরা তাদের দেব-দেবী ও বিভিন্ন কবর ও বেদীতে পূজা দেয় ও মূর্তির উদ্দেশ্যে কুরবানী করে থাকে। তার প্রতিবাদ স্বরূপ মুসলমানকে আল্লাহর জন্য ‘ছালাত আদায়ের ও তাঁর উদ্দেশ্যে কুরবানী করার’ হুকুম দেওয়া হয়েছে। * ঈদুল আযহার দিন প্রথমে আল্লাহর জন্য ঈদের ছালাত আদায় করতে হয়, অতঃপর তাঁর নামে কুরবানী করতে হয়।
কুরবানীর গোশÍ, রক্ত আল্লাহ কাছে পৌছায় নাঃ
لَنْ يَّنَالَ اللهَ لُحُوْمُهَا وَلاَ دِمَاؤُهَا وَ لَكِنْ يَّنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ (الحج ৩৭(
অর্থঃ ‘কুরবানীর পশুর গোশত বা রক্ত আল্লাহর নিকটে পৌঁছে না। বরং তাঁর নিকটে পৌঁছে কেবলমাত্র তোমাদের ‘তাক্বওয়া’ বা আল্লাহভীতি’ (হজ্জ ২২/৩৭)।
সামর্থ্যবানদের জন্য কুরবানীর আবশ্যকতা ও হুশিয়ারী-
যাঁদের ওপর যাকাত ফরজ বা কুরবানীর দিনগুলোতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ মালের মালিক থাকবেন, তাঁদের ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা অলসতা বা কৃপণতা করে কুরবানী দেয় না, তাদের ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন:
مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا
অর্থ: “যার কুরবানী করার সামর্থ্য আছে, অথচ সে কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)
কুরবানীর ইতিহাসঃ আল্লাহ বলেন,
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِّيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ ۗ فَإِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا ۗ وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ
“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছি, যাতে আল্লাহ তাদেরকে রিযিক স্বরূপ যে চতুষ্পদ জন্তু দান করেছেন, সেগুলোর ওপর (জবেহ করার সময়) তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে। তোমাদের ইলাহ (উপাস্য) তো একমাত্র ইলাহ, কাজেই তোমরা তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ করো এবং সুসংবাদ দাও বিনীত ও অনুগতদের।” (সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩৪)
কুরবানীর সময়:
যিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত মোট তিন দিন কুরবানীর সময়। তবে সবচেয়ে উত্তম হল প্রথম দিন কুরবানী করা। এরপর দ্বিতীয় দিন এরপর তৃতীয় দিন।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫
পশু জবেহের সময় দুয়াঃ
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন দু’টি দুম্বা যবেহ করেছেন। যবেহর সময় সেগুলোকে কিবলামুখী করে বলেছেন-
اِنِّیْ وَجَّهْتُ وَجْهِیَ لِلَّذِیْ فَطَرَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ حَنِیْفًا وَّ مَاۤ اَنَا مِنَ الْمُشْرِكِیْنَ اِنَّ صَلَاتِیْ وَ نُسُكِیْ وَ مَحْیَایَ وَ مَمَاتِیْ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ لَا شَرِیْكَ لَهٗ ۚ وَ بِذٰلِكَ اُمِرْتُ وَ اَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِیْنَ ، بِسْمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبرُ، اَللّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ عَنْ مُحَمَّدٍ وَّأُمَّتِهِ.
-সুনানে আবু দাউদ ৩/৯৫, হাদীস : ২৭৯৫; মুসনাদে আহমদ ৩/৩৭৫ হাদীস : ১৫০২২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২৮৯৯
অন্য আয়াতটি হল সূরা কাউসারের দ্বিতীয় আয়াত। ইরশাদ হয়েছে-
اِنَّاۤ اَعْطَیْنٰكَ الْكَوْثَرَؕ۱ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَ انْحَرْؕ۲ اِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْاَبْتَرُ۠۳
এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং তাঁর মাধ্যমে গোটা উম্মতকে সালাত (নামায) ও নাহর (কুরবানীর) আদেশ দেওয়া হয়েছে। ‘নাহর’ শব্দের মূল অর্থ উট যবেহ করা, তবে সাধারণ ব্যবহারে যেকোনো পশু যবেহ করাকেই ‘নাহর’ বলে।
কুরবানীর পশুর বয়সসীমা ঃ
মাসআলা : ১৪. উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে।
আরাফার দিনের সিয়াম :
আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন-
صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُّكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِىْ قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِىْ بَعْدَهُ رواه مسلم-.
‘আরাফার দিনের নফল ছিয়াম (যারা আরাফাতের বাইরে থাকেন তাদের জন্য) আমি আল্লাহর নিকট আশা করি যে, তা বিগত এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে’।
কোরবানি দাতা যে সকল কাজ থেকে দূরে থাকবেন
হাদিসে এসেছে: উম্মে সালামাহ রা. থেকে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: “তোমাদের মাঝে যে কোরবানি করবে সে যেন যিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।
কোরবানির দিনের করণীয়
ড় পায়ে হেঁটে ঈদগাহে গিয়ে ঈদের সালাত আদায় করা সুন্নাহ।
ড় এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া ও অন্য রাস্তা দিয়ে আসা সুন্নাহ।
ড় ঈদুল আযহার বিশেষ আমল হলো, ঈদের সালাতে যাওয়ার আগে কোন কিছু না খাওয়া। একবারে কুরবানী করার পর গোস্ত দিয়ে খাবার খাওয়া।
ড় সুগন্ধি ব্যবহার করা,
ড় গোসল করা/ পবিত্রতা অর্জন করা।
ড় সাধ্যের মধ্যে উত্তম পোশাক পরিধান করা।
ড় ঈদগাহে যাওয়া ও আসার সময় তাকবীর পাঠ করা।
ড় কোরবানির পশু জবেহ করা ও তার গোশত অসহায়দের মাঝে বিতরণ করা।
এ দিনটাকে শুধু খেলা-ধুলা, বিনোদন ও পাপাচারের দিনে পরিণত করা কোন ভাবেই ঠিক নয়।
আল্লাহ পাক আমাদেরকে উক্ত কথাগুলো আমল করার তাওফিক দান করুন।
দুই ঈদে তাকবীর প্রসঙ্গঃ
ان النبى صلى الله عليه وسلم كبر فى الاولى سَبْعًا قبل القراءة وفى الاخره خمسًا قبل القراءة،،
নবী করিম (সঃ) দুই ঈদের সালাতের ১ম রাকাতে ৭টি ও ২য় রাকাতে ক্বেরাতের পূর্বে ৫টি তাকবীর পড়তেন।
সমাপনী ও দুআ
হে আল্লাহর বান্দাগণ!
আসুন, আজ ঈদুল আযহার এই পবিত্র দিনে আমরা প্রতিজ্ঞা করি, আমরা আমাদের জীবনকে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী পরিচালনা করব। কুরবানীর শিক্ষাকে বুকে ধারণ করে নিজেদের খাঁটি মুমিন হিসেবে গড়ে তুলব। আল্লাহ তাআলা আমাদের আজকের এই ঈদের জামাতকে কবুল করুন, আমাদের জীবনে তাকওয়া দান করুন এবং ইব্রাহিমী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ত্যাগের মানসিকতা দান করুন।
আল্লাহ, তুমি গাজার মুসলিমদের উপর সাহায্য দান করুন। তাদেরকে তুমি বিজয়ী করুন। ফিলিস্তিনকে স্বাধীনতা দান করুন।
أَقُولُ قَوْلِي هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ لِي وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُسْلِمِينَ، فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ۞
(আমীন, ছম্মা আমীন।)
আব্দুল খালেক
পরিচালক-
নূরানী কিন্ডারগার্টেন।
গোদাগাড়ী হাফেজিয়া মাদরাসা
গোদাগাড়ী ইসলামিয়া মাদরাসা
এস.কে কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার এন্ড আইটি
গোদাগাড়ী, রাজশাহী।
০১৭২১-০৩১৮৯৪
www.skcomputer.bd
[email protected]











